
বিভাস মল্লিক (কেসিসি)- বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার এক গ্রামে পাঁচ বোন(এক বোন ছোটো বেলায় মারা যান) দুই ভাইয়ের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ মুকেশ কুমারের ছোটো থেকেই ক্রিকেট খেলা ছিল সবচেয়ে প্রিয় কিন্তু পেশায় ট্যাক্সি চালক পিতা কাশী নাথ সিং এর পক্ষে ছেলেকে ভালো কোনো কোচিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষমতা ছিলনা। মুকেশ এবং তার ভাই বোনরা বিহারে থাকলেও মুকেশের বাবা প্রায় চল্লিশ বছর কলকাতাতেই থাকতেন উপার্জনের তাগিদে। মৌলালির নিকটস্থ তালতলা বাজারে ভাড়ার ঘরে।
মুকেশ বিহারে বন্ধুদের সাথে টেনিস বলে বিভিন্ন জায়গাতে ক্রিকেট খেলতে যেত পড়াশোনা থেকেও টেনিস বল ক্রিকেট ছিল তার কাছে বেশি আগ্রহের কিন্তু বাবা চাইতেন ছেলে একটু লেখা পড়া শিখে দাদার মত যেকোন একটা চাকরি করুক কলকাতায়।
২০০৩ সাল থেকে মুকেশের কলকাতাতে যাওয়া আসার সূত্রে বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব কলকাতাতে হয়েছিল তাদের কাছেই কলকাতার ক্রিকেট গল্প শুনে বাংলার ক্রিকেট সম্পর্কে ধীরে ধীরে মুকেশের আগ্রহের সূত্রপাত তার পাকাপাকি ভাবে যখন ২০১১ সালে কলকাতা চলে আসলে এখনকার বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারেন কালীঘাট ক্লাবের কথা এবং একদিন কালীঘাট ক্লাবে সরাসরি হাজির হোন লাল বলের ক্রিকেট খেলার উদ্দেশ্যে এর আগে মুকেশের লাল বলের ক্রিকেটের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কালীঘাট কোচিং ক্যাম্পের কোচ কলকাতা ময়দানের প্রাক্তন ক্রিকেটার বিরেন্দ্রার সিংয়ের কাছে লাল বলের ক্রিকেটের হাতেখড়ি মুকেশের এবং মুকেশের মধ্যে আগামী দিনে একজন ভালো বোলার হয়ে ওঠার উপকরণ মজুত আছে সেটা কোচ বুঝতে পারেন কিন্তু এর মাঝেই মুকেশ কলকাতা ক্লাব ক্রিকেটে খেলার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকেন। একটা সুযোগ এসেও ছিল কালীঘাট ক্লাবে কিন্তু কলকাতার ক্রিকেটে তখন একদম নবাগত মুকেশকে এই ক্লাবের এক মালি বোঝান প্রথমেই কালীঘাটের মত বড়ো ক্লাবে সই করলে প্রথম একাদশে সুযোগ পাবে না শুধু জল বইতে হবে কি বড়ো জোর নেট বোলার হিসাবেই ক্রিকেট জীবনের স্বপ্নের ইতি হতে পারে। সেই মালির কথা মুকেশের খুব যুক্তিপূর্ণ মনে হওয়ায় মনস্থির করে একদম শূন্য থেকে শুরু করবে এবং সংকল্প নেন একদিন বাংলার হয়ে খেলার। মুকেশের এই রকম ক্রিকেটের প্রতি টান দেখে একপ্রকার বাধ্য হয়ে তার বাবা কালীঘাট ক্লাবের কোচিং ক্যাম্পে পাঠান এই ভেবে যে ওখানে প্রচুর খাটাবে আর সেই ভয়ে তার ছেলে ক্রিকেট ছেড়ে কাজে কর্মে মন দেবে কিন্তু মুকেশের ভেতর যে ক্রিকেট ঘিরে স্বপ্ন সংকল্প ছিল তা ঘুণাক্ষরেও বাবা টের পান নি। ২০১১-১২ মরশুমে কলকাতার দ্বিতীয় ডিভিশন ক্লাব বাণী নিকেতনের হয়ে মুকেশের কলকাতা ক্লাব ক্রিকেটে যাত্রা শুরু এবং ঘটনা চক্রে প্রথম ম্যাচেই কালীঘাট মাঠেই নবাগত মুকেশ সেই সময় ইন- আউট সুইং টুইং না বুঝলেও নিয়ন্ত্রিত লাইন এবং পেসের সাহায্যে ছয় উইকেট তুলে নেন । বাণী নিকেতনের হয়ে ৪ টে ম্যাচে ১২ উইকেট পান মুকেশ এবং পরের মরশুমে প্রথম ডিভিশন ক্লাব শিবপুর ইনস্টিটিউট ক্লাবের হয়ে খেলার মাঝেই এসে যায় একটা সুযোগ। মুকেশ খবর পায় সেই সময় সদ্য শুরু হওয়া ভিশন ২০-২০ র জন্য ট্রায়াল ডাকা হয়েছে এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে সেই ট্রায়ালে যোগ দিয়েই প্রধান কোচ বিশ্বের অন্যতম সেরা পেস বোলার পাকিস্থানের ওয়াকার ইউনিসের নজরে আসে আজকের বাংলার পেস বোলিং বিভাগের অন্যতম স্তম্ভ মুকেশ কুমার। এই ট্রায়ালে বাংলার প্রাক্তন দুই ক্রিকেটার জয়দীপ মুখার্জি এবং রনদেব বোসের কাছে নানা পরামর্শ পান মুকেশ ।
ভিশন ২০ -২০ ক্যাম্পে থাকাকালীন রণদেব বোসের সাথে টাউন ক্লাবের কর্মকর্তার কথা হয় মুকেশকে টাউন ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য কারণ টাউন ক্লাবে খেললে মুকেশ আরো ভালো করবে বলেও তাদের বিশ্বাস ছিল এবং রনদেবের পরামর্শ মতো মুকেশ টাউন ক্লাবের হয়ে ধারাবাহিক পারফরমেন্স ২০১৫-১৬ সালে রোহোতকে হরিয়ানার বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকেই সুনিয়ন্ত্রিত লাইন লেংথ বজায় রেখে প্রথম ইনিংসেই ৫৩ রানে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাকে প্রথম ইনিংসে লিড পেতে সাহায্য করেন। এই মরহুমের বিজয় হাজারে এবং সৈয়দ মুস্তাক আলী প্রতিযোগিতায় বাংলার হয়ে অভিষেক হয় মুকেশের তারপর থেকে নিজের দক্ষতায় বাংলার বোলিং এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পরিণত হাওয়া মুকেশ কুমার গত মরশুমে রঞ্জি ফাইনালে ওঠার নেপথ্যে তার অবদান অনস্বীকার্য। সেমি ফাইনালে ভারতীয় ক্রিকেটের শক্তিশালী দল কর্ণাটকের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ঈশান পড়েল পাঁচ উইকেট নিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মুকেশ কুমার ৬১ রানে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলার ফাইনালে ওঠার পথ প্রশস্ত করেন।
এখন পর্যন্ত ২২ টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৮০ উইকেটের মালিক মুকেশ কুমারকে ঘিরে বাংলার ক্রিকেট প্রেমীরা ভীষণ আশাবাদী আগামীদিনে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে। বর্তমানে এ.জি বেঙ্গলে কর্মরত মুকেশের পিতা প্রাথমিক ভাবে ছেলের ক্রিকেট নিয়ে উৎসাহ না দেখলেও পরবর্তীকালে তিনি ছোটো ছেলেকে উৎসাহিত করতেন ভালো খেলতে এবং তিনি চাইতেন ছেলে একদিন জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে কিন্তু গত বছর পিতা কাশীনাথ সিং এর আকস্মিক প্রয়াণ ঘটলেও মুকেশ লক্ষ্য কঠোর পরিশ্রম করে আগামীদিনে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়ে পিতার ইচ্ছা পূরণ করতে।



Wonderful write up
LikeLiked by 1 person