বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে রত্ন

বিভাস মল্লিক (কেসিসি)- গড়িয়াহাট রোডের নিকটস্থ জগবন্ধু ইনস্টিটিউশন স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে একদিন তাদের ক্রীড়া শিক্ষক সুভাষ দত্ত বোটানিক্যাল গার্ডেন ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিলেন আর সচরাচর ছাত্রাবস্থায় এই রকম স্কুলের শিক্ষকদের সাথে শিক্ষামূলক ভ্রমণে গেলেও ব্যাট বল, ফুটবল বা ব্যাডমিন্টন রেকেট ইত্যাদি খেলার সরঞ্জাম সঙ্গে থাকে। সেইদিন জগবন্ধু ইনস্টিটিউশনের ছাত্রদের সাথেও ব্যাট বল থাকায় নিজেদের মধ্যে দল তৈরি করে খেলা কালীন ক্লাস সিক্সের এক ছাত্র স্যারের নজরে আসেন তার ব্যাটিং শৈলী দেখে শিক্ষক সুভাষ বাবু মনস্থির করেন বছর বারোর এই ছাত্রকে স্কুলের সিনিয়র দলে খেলবেন। সেই সময় এই স্কুলের ক্রিকেট টীমের খুব সুনাম ছিল আর হবে নাই বা কেন প্রাক্তন টেস্ট তারকা সুব্রত গুহ এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। মাত্র বারো বছর বয়সে স্কুল টিমের হয়ে খেলা শুরু করে ক্রমাগত ভালো পারফর্ম করতে থাকা ছাত্রটি সর্ব বাংলা স্কুল দলে সুযোগ পান এবং এই দলে তার সঙ্গী ছিলেন বাংলার ক্রিকেটের উজ্জল নক্ষত্র পলাশ নন্দী, প্রলয় চেল প্রমুখেরা এরপর পূর্বাঞ্চল স্কুল তারপর ভারতীয় স্কুল দলে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ডাক পান জগবন্ধু ইনস্টিটিউশনের সেইদিনের ক্লাস সিক্সের ছাত্র যিনি পরবর্তী কালে বাংলার ক্রিকেটের সবার প্রিয় এবং শ্রদ্ধার রাজা মুখার্জি।
রাজা মুখার্জির গড়িয়াহাট রোডের কাছে বাড়ীর প্রশস্ত উত্তরণেই টেনিস বলে ছোটবেলায় ক্রিকেটের হাতেখড়ি এবং সেই সময় তার সহজাত ব্যাটিং শৈলীকে আরো নিখুঁত করতে তার স্কুলের দাদা সতীর্থ সুব্রত গুহ টেনিস বল জলে ভিজিয়ে রীতিমত জোরে বল করতেন এছাড়াও ঋতেন বোস, শিবাজী রায়ের মত ক্রিকেটাররা সবাই ওই বাড়িতেই আসতেন খেলতে। ভ্রাতৃসম রাজাকে ভালো ব্যাটসম্যান করতে চাইতেন তাই ওনাকে বেশি ব্যাট করতে দিতেন। ছোটো থেকে এইভাবেই ক্রিকেটের যাত্রা শুরু রাজা মুখার্জির তথাকথিত কোনো কোচের কাছে কাছে ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ না পেলেও পরবর্তী কালে ব্যাটিং এর খুঁটিনাটি ব্যাপারে উন্নতি করতে তাকে সুনীল দাসগুপ্ত সাহায্য করেন। স্কুলে পড়াশোনার সাথেই সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বালিগঞ্জ ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে ক্লাব ক্রিকেট শুরু করেন রাজা মুখার্জি। এই সময় স্কুল ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরমেন্সের পর সিএবি থেকে তার নাম বাংলা স্কুল দলের জন্য পাঠানো হলে তিনি বাংলা স্কুল দলের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তারপর পূর্বাঞ্চল স্কুল দলের হয়ে নজরকাড়া পারফর্ম ১৯৬৭-৬৮ সালে অজিত নাইকের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় স্কুল দলের হয়ে ইংল্যান্ড সফরে ডাক পান।

১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ড সফরে অল ইন্ডিয়া স্কুল টিম ।
দাঁড়িয়ে বাঁদিক থেকে – এস.মাথুর ( এ্যা.ম্যানেজার), মহিন্ডার অমরনাথ, সুরিন্দর অমরনাথ, লক্ষ্মণ সিং, জাসবীর সিং, অজিত নায়েক (অধিনায়ক), ভি.ফার্নান্দেজ, জে.কে.মহেন্দ্র, কিরমানি, কর্নেল হিমু অধিকারী ( ম্যানেজার), আসিফ, শ্রীরাম (বিসিসিআই সচিব), এস সাহু ( নির্বাচক)
বসে বাঁদিক থেকে – দীপঙ্কর সরকার, ইন্দররাজ , টান্ডন, রাজা মুখার্জি, অরুণ কুমার , অভি কামেকার, এবং জে ভুট্টা।
ছবি সৌজন্য – ক্রিকেটার ম্যাগাজিন।

বাংলা থেকে সেই দলে রাজা মুখার্জি ছাড়াও দীপঙ্কর সরকার সুযোগ পান এবং এই সফরে প্রায় ১৭টি ম্যাচে ভারতীয় দল একটি বাদে সব ম্যাচ অপরাজিত থেকে সফর শেষ করে। এই সফরে তার সঙ্গী ছিলেন ভারতীয় টেস্ট তারকা মহিন্দর অমরনাথ, সুরিন্দর অমরনাথ, সৈয়েদ কিরমানির মতো ক্রিকেটাররা। এইবসফরে ব্রিটিশ স্কুলের বিরুদ্ধে ভারতীয় স্কুল দল একটি ম্যাচে ২০৩ রান তাড়া করতে গিয়ে শেষ ওভারে পর পর দু বলে দুটি ছয় মেরে নিজের সেঞ্চুরি করেন সুরিন্দর অমরনাথ এবং দলকে জেতালেও তার সাথে রাজা মুখার্জির ৭৫ রানের ইনিংস এবং দুজের জুটিতে ১৪৩ রানের পার্টনারশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সফরে রাজা মুখার্জি দুটি শতরান সহ বেশ কয়েকটি গুুত্বপূর্ণ ইনিংস ভারতীয় দলকে উপহার দেন। বাংলা স্কুল বা পূর্বাঞ্চলীয় স্কুলের হয়ে রাজা মুখার্জি উইকেট যথেষ্ট দক্ষতার সাথে উইকেট কিপিং করলেও ভারতীয় স্কুল দলের হয়ে তিনি কিপিং করেন নি কারণ নির্বাচকরা তাকে বলেছিলেন উইকেট কিপিং করলে ক্লান্ত হয়ে যাবে যার প্রভাব ব্যাটিং এ পড়তে পারে। নির্বাচকরা রাজা মুখার্জিকে একজন ব্যাটসম্যান হিসাবেই দলে চাইছেন কারণ ব্যাটসম্যান রাজা মুখার্জিকে ভারতীয় স্কুল দলের প্রয়োজন তুল্যমূল্য ভাবে অনেকাংশেই বেশি।
ইংল্যান্ড সফর থেকে ফিরে কলকাতা ক্লাব ক্রিকেট প্রথম ডিভিশন ক্লাবের সদস্য রাজা মুখার্জির ১৯৬৭-৬৮ মরশুমে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাংলার হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট অভিষেক। শ্যাম সুন্দর মিত্রর নেতৃত্বাধীন বাংলা দলের হয়ে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৬৭ সালে উড়িশ্যার বিরুদ্ধে রবিন মুখার্জির সঙ্গী হিসাবে ইনিংসের গোড়াপত্তন করেই প্রথম উইকেটের জুটিতে রাজা মুখার্জির দৃষ্টিনন্দন ৬৩ রানের ইনিংস সহ ১১২ রানের পার্টনারশিপ করেন। বাংলার হয়ে খেলা চলাকালীন ১৯৬৮-৬৯ মরশুমে আবার ভারতীয় স্কুল দলের হয়ে অস্ট্রেলীয় সফরে অধীনায়কের ভূমিকাও পালন করেন। এই সফরে বাংলা থেকে তিনি ছাড়াও দীপঙ্কর সরকার (যিনি আগের ইংল্যান্ড সফরে চমৎকার বোলিং করে ৬৫টি উইকেট দখল করেন ) এবং রবি ব্যানার্জী ছিলেন এছড়াও ব্রিজেশ প্যাটেল, মহিন্দার অমরনাথ, বুধি কুন্দরান, কার্সেন ঘাউড়ি মতো পরবর্তী কালের ভারতীয় টেস্ট তারকারা ছিলেন। ক্যানেবেরাতে অস্ট্রেলীয় স্কুল বয়েজ দলের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং সহায়ক উইকেটে তিনি ৫৩ রান করে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। রাজা মুখার্জির ব্যাটিং দেখে ইয়াণ চ্যাপেল এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নেটে যখন রাজা মুখার্জি ব্যাটিং করতেন উনি নেটের পেছনে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন। কলকাতা ময়দানেও রাজা মুখার্জির বহু ময়দান খ্যাত ক্রিকেটাররাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওনার ব্যাটিং উপভোগ করতেন।
এই সফরে রাজা মুখার্জি সহ ভারতীয় দলের অনেকেই ভালো পারফর্ম করার সুবাদে ভারতীয় স্কুল দল অনবদ্য পারফর্ম করে অস্ট্রেলীয়দের প্রশংসা আদায় করেন।
সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেট মহলে স্কুল ক্রিকেটের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি কিন্তু রঞ্জি ট্রফি আর বাংলা বা পূর্বাঞ্চলীয় এমনকি ভারতীয় স্কুলের খেলা এক সময় হতো তাই বাংলা দলের রাজা মুখার্জীর মতো জুনিওর ক্রিকেটারদের ভারতীয়, বাংলার বা পূর্বাঞ্চলীয় স্কুল দলের হয়ে খেলতে বলা হত কারণ বাংলা নির্বাচক মন্ডলী জানতেন স্কুলের খেলার পর অভিজ্ঞতাও হবে এবং আগামীদিনে বাংলা দলের হয়ে খেলতে যা তাদের সাহায্য করবে। রাজা মুখার্জি বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেট আইকন সুনীল গাভাস্কারের বিরুদ্ধেও আঞ্চলিক (জোনাল ) স্কুল প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে রাজা মুখার্জি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে রহিংটন বেরিয়া প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট সুনামের সাথেই খেলেছিলেন।
রাজা মুখার্জি ১৯৬৭-৬৮ মরশুম থেকে শুরু করে ১৯৭৮-৭৯ মরশুম পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেন বাংলা, রেলওয়ে (১৯৭০-৭১) এবং পূর্বাঞ্চল দলের হয়ে । ১৯৭৫-৭৬ মরশুমে রাজা মুখার্জি ইডেনে আসামের বিরুদ্ধে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ওপেনার পলাশ নন্দীর সাথে দ্বিতীয় উইকেটের জুটিতে অবিচ্ছেদ্য ৩১৭ রান করেন। পলাশ নন্দী ২০৫ রানে এবং রাজা মুখার্জি ১২৪ রানে অপরাজিত থাকেন পরের ম্যাচে রাউরকেল্লাতে উড়িস্যার বিরুদ্ধে ওপেন করে নিজের জীবনের সেরা স্কোর ১৫৪ রান করেন রাজা মুখার্জি এবং দ্বিতীয় উইকেটের জুটিতে প্রকাশ পোদ্দারকে(১২৬ রান) সঙ্গী করে ২৫৮ রান যোগ করেন। পরের ম্যাচে পাটনায় বিহারের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ৫ রানে আউট হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭ রানে অপরাজিত থেকে বাংলাকে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ পয়েন্ট পেতে সাহায্য করেন। সেমিফাইনালে বোম্বে (অধুনা মুম্বাই) এর বিরূদ্ধে ধৈর্য্যশীল ৪৮ রানের ইনিংস তার ব্যাট থেকে বেড়িয়ে আসে। এই মরশুমে ধারাবাহিক ভাবে রান করলেও আত্যশ্চর্য ভাবে ১৯৭৬ ভারত সফররত ইংল্যান্ড দল (এম.সি.সি) বিরুদ্ধে পূর্বাঞ্চল দলে তিনি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ডাক পাননি তবে বর্তমান যুগের মতো এত মিডিয়ার কভারেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা সেই সময় থাকতো তাহলে এই অজ্ঞাত কারণ নিয়ে বাংলার ক্রিকেট মহলে সরগরম নিশ্চিত ছিল।তিনি ১৯৬৯-৭০ সালে ভারত সফরে বিল লরির নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলীয়া দলের বিপক্ষে গৌহাটিতে পূর্বাঞ্চল দলের হয়ে খেলেন এবং আল্যান কানোলি , এরিক ফ্রিম্যান, লরি ম্যায়নে এর মত জোড়ে বোলার এবং জন গ্লিসনের মতো লেগ ব্রেক বোলারের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে দলের সর্বোচ্চ ৩৩ রান করেন।

প্রায় একদশকের বেশি সময় ধরে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলা ডান হাত ওপেনার রাজা মুখার্জি ৩৪টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে চারটি শতরান সহ ১৫২৬ রান করেন যার মধ্যে সর্বোচ্চ রান অপরাজিত ১৫৪ রান। ৩টি লিস্ট – এ ম্যাচও তিনি খেলেন। বাংলার হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে ৪৯.৮২ গড়ে তিনি রান করেন। বাংলার ক্রিকেটের দুর্ভাগ্য যার ব্যাটিং প্রতিভা ক্রিকেট জগতের বহু মানুষকে মুগ্ধ করত তিনি মাত্র ১৮ টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান বাংলার হয়ে।

Published by Kolkata Club Cricket

Cricket news and informations from every corner

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started